রাসেল ইব্রাহীমের টিউশনির ১৯ তম বছরে পদার্পণ
রাসেল ইব্রাহীম।।
২০০৮ সাল। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠলাম। কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছেলেদের মধ্যে আমার রোল নম্বর ৯ থেকে ৩ হলো। ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন একটি পরিচয় তৈরি হলো। তখনও জানতাম না, এই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে আমার জীবনের দীর্ঘ এক অধ্যায়—সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন এক বন্ধুকে একদিন বলেছিলাম, "ইশ্! যদি দু-একটা টিউশনি পেতাম, তাহলে অল্প টাকা দিয়েই পড়াতাম।” বাবা কৃষিকাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা থেকেই হয়তো টিউশনির চিন্তাটা মাথায় এসেছে।
৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮। চাচি খবর দিলেন, তাঁর ছেলে আরমান হোসেনকে(প্রথম শ্রেণির ছাত্র)প্রাইভেট পড়াতে হবে। মনে মনে ভীষণ খুশি হলাম। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হলো আমার টিউশনি জীবন। মাসিক বেতন ১৫০ টাকা।পরের দিনই আরেকজন শিক্ষার্থী পেলাম, বেতন ১৫০ টাকা। এরপর ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর আরও দুজন শিক্ষার্থী পেলাম—একজন দ্বিতীয় শ্রেণির, অন্যজন শিশু শ্রেণির। তাঁদের বেতন ছিল যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ টাকা।
শুরুর দিকে শিক্ষার্থীর নাম, পড়ানোর তারিখ ও বেতনের পরিমাণ ডায়েরিতে লিখে রাখতাম। কয়েক মাস পরপর হিসাব করতাম—কত টাকা আয় করেছি। ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টিউশনি করে পেয়েছিলাম ৫১ হাজারেরও বেশি টাকা। এরপর আর নিয়মিত হিসাব রাখা এভাবেই শুরু। আজও চলছে—আলহামদুলিল্লাহ।
টিউশনির পথে প্রথম ধাক্কা:
টিউশনির সঙ্গে শুধু টাকা নয়, এসেছে বহুমুখী অভিজ্ঞতা। কখনো আনন্দ, কখনো অপমান, কখনো কষ্ট, কখনো আবার আত্মবিশ্বাস।একই শ্রেণির চারজন শিক্ষার্থী একই বাড়িতে পড়ত। আমি পড়াতাম দুজনকে, অন্য দুজনকে পড়াতেন ডিগ্রিতে পড়া একজন ছাত্র। তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের বলতেন, "রাসেল তো সেভেনে পড়ে, আমিই তো ওকে পড়াতে পারি।”
কথাগুলো ঘুরে আমার শিক্ষার্থীদের কাছেও আসত। শুনে খুব খারাপ লাগত। বয়সে ছোট বলে হয়তো তখন কথাগুলো আরও বেশি কষ্ট দিতসময় নিজের উত্তর নিজেই দিয়েছে। তিনি টিউশনি জগতে টিকে থাকতে পারেননি। এখন হেঁটে হেঁটে মোবাইলের সিম বিক্রি করেন। আর আমি—সেই সপ্তম শ্রেণির ছাত্র—আজও টিউশনি করছিতবে কাউকে ছোট করার জন্য কথাটা বলছি না। জীবনের পথ সবার জন্য এক নয়। শুধু বলতে চাই, সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়।
লুঙ্গি টেনে ধরা সেই শিক্ষার্থী:
টিউশনির সবচেয়ে মজার স্মৃতিগুলোর একটি ক্রিকেট মাঠের।একদিন বিকেলে দুজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলাম। আমার ব্যাটিং শেষ। বললাম, "চল, এখন পড়ার টাইম। তোরা পরে ব্যাটিং করিস।”
হঠাৎ একজন আমার লুঙ্গি টেনে ধরে বলল, "বলিং করে যেতে হবে, খেলা দিয়ে যেতে হবে।”আমি তো অবাক!
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সীমারেখাটা সেদিন যেন নতুন করে বুঝলাম। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খেলাধুলা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছি।
২০০ টাকার ঈদ:
টিউশনির টাকা পেয়ে কান্না করেছি—এ কথাটাও সত্য।অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় একজন শিক্ষার্থীর মায়ের অনুরোধের কারণে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং শিক্ষার্থীর বাবার অনুরোধে দুজনকে পড়াতে শুরু করেছিলাম। ঈদের আগে টিউশনির প্রায় সব টাকা অন্য কাজে খরচ হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম, ওই দুই শিক্ষার্থীর বেতন দিয়ে নিজের ঈদের জামাকাপড় কিনব।
কিন্তু ঈদের আগে টাকা পেলাম না। সম্ভবত ঈদের দিন ২০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। একজন শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়ায় তার বেতনও দেওয়া হনতুন জামা কিনতে পারিনি। ঈদের নামাজও পড়িনি। ঘরে শুয়ে কেঁদেছিলামআজ ভাবলে বিষয়টি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু তখন ঈদ মানেই ছিল নতুন জামাকাপড়। ঈদের আনন্দটাও যেন নতুন পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলসময়ের সঙ্গে টিউশনি বাড়ল। বাবা ও চাচা জসিম উদ্দীনের সহযোগিতার পাশাপাশি টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে শুরু করলামেম্বারের মেয়েকে পড়াড়ানোর অভিজ্ঞতাইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এসে বললেন, "ভাতিজা, আমার মেয়েটাকে পড়াও, মাস শেষে খুশি করে মেম্বারের মেয়েকে পড়াব—ভাবতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাতাঁর শিশু শ্রেণির মেয়েকে প্রায় দেড় মাস পড়ানোর পর টাকা চাইলাম। পরে তাঁর স্ত্রী অন্য একজনের মাধ্যমে ১৫০ টাকা পাঠালআমি হতবাক।
অন্যদের বেতন তখন ৪০০ টাকা। মেম্বার সাহেবের মেয়ে পড়াই বলে ৫০০ টাকা আশা করেছিলাম। তাই টাকা নিতে চাইনি। বলেছিলাম, আমি ফিতরার টাকা নিই নাপরে মেম্বারের স্ত্রী এসে বললেন, "বাবা, তুই আই দেহি যা, হিতরার টেঁয়া আলাদা রাখছি।”কিছুদিন পর আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। অভাবের তাড়নায় শেষ পর্যন্ত টাকাটা নিয়েছিলাম।
ঘরে সবকিছু দামী, জীবনযাপন বিলাসবহুল—কিন্তু সন্তানের শিক্ষার জন্য যেন কোনো বাজেট নেই। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।আর যারা দিন আনে দিন খায়, তারাও কষ্ট করে সন্তানের পড়ার টাকা দেয়—তাঁদের প্রতি আমার স্যালুট।
কম বেতনের টিউশনি, কম মূল্যায়ন:
টিউশনির একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো—যাদের সর্বাত্মক দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যাদের জন্য বেতন কমিয়েছি কিংবা ছাড় দিয়েছি, তাদের কেউ কেউ আমাকে যথাযথ মূল্যায়ন কএকজনের বেতন কম রাখলে সে অন্যের কাছে বলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিতখন বুঝেছি—সবকিছু বিনামূল্যে বা কম মূল্যে দিলে অনেক সময় তার মূল্যও কমে যায়আরেকটি বিষয়ও আমাকে ভাবায়। স্কুলে থাকা কিংবা প্রাইভেট পড়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী ‘স্যার’ বলে ডাকত। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর সেই একই শিক্ষার্থী আমাকে ‘ভাই’ বলে ডাকতে শুরু করেছে। ‘স্যার’ ডাকতে তারা যেন লজ্জা‘ভাই’ ডাকায় আমার আপত্তি নেই। কিন্তু প্রথম থেকেই যদি 'ভাই’ বলত, সেটিই স্বাভাবিক ছিল। সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্মানের পরিবর্তন হওয়াটা আমাকে কষ্ট দেযএকজন শিক্ষকের একটি কথা মনে পড়ে—‘যে ছাত্র শিক্ষকের পরিচয় অস্বীকার করে, সে একদিন পিতৃপরিচয়ও অস্বীকার করবে।’ কথাটি শুনেছিলাম আলামিন সবুজ স্যারের কাছতবে এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুষম দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করি। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়।টিউশনিই আমাকে সুযোগের দরজা দেখিয়েছে:
টিউশনি করতে করতে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও অনেক কিছু পেয়েছিঅনার্স সেকেন্ড/থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ এবং গাজীপুর ফাজিল মাদ্রাসায় ফিজিক্সের গেস্ট টিচার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেযরায়পুর কাজী ফারুকী স্কুল অ্যান্ড কলেজেও শিক্ষকতার অফার পেয়েছিলাম। ভাইভা দিয়ে এসে যাব বলে আর যাওয়া হযঅধ্যাপক কে এম মেছবাহ উদ্দিন স্যারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। তাঁর কাছে চিরদিন ঋণী হয়ে থাকব।আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছি। এসব আমার জন্য পরম প্রাপ্তি।
তবে উপজেলার একটি কোচিং সেন্টারে যোগ দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছিলাম। জীবনের কিছু ভুল মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। সেই ভুলটিও আমার আজীবন মনে থাকবে।
ছাত্রজীবনেই বই ও গান:
টিউশনি করার পাশাপাশি ছাত্রজীবনেই আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে—‘তুমি অপরা, প্রেমবিদ্যা এবং চমৎকার পদার্থবিজ্ঞান।বিশের মতো গান লিখেছি। এর মধ্যে চারটি গান—‘আমার একটা তুমি ছিল’, ‘আমার বন্ধুরা খুব দুষ্টু ছিল’, ‘মীরজাফরের বংশধর’ এবং ‘একটা চাকরি চাই’—রিলিজ হয়েছে এবং গানগুলো প্রশংসিতও হয়েছে।
জীবনের একটি স্বপ্ন আছে—আদর্শ শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি অন্তত দশটি জনপ্রিয় গানের গীতিকার হওয়া।
টিউশনির নাস্তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়:
টিউশনি জীবনের আরেকটি মজার অধ্যায় হলো—নাস্তা।আমি সবসময় টিউশনির নাস্তা খুব উপভোগ করি।
একদিন এক বাসায় নাস্তা দেওয়ার পর বলেছিলাম, আমি এগুলো পছন্দ করি নাতারপর বলতে গেলে নাস্তাই বন্ধ হয়ে গেল!সেদিন থেকে শিক্ষা নিয়েছি—খাবারের ব্যাপারে অতিরিক্ত পছন্দ-অপছন্দ দেখানো ঠিক নয়। এখন আর লজ্জা পাই না। যখন যা দেয়, তাই খাই।
খাবার রেডি হওয়ার শব্দ পেলে হয়তো একটু বেশি পড়াই! তবে খাবারের শব্দ শুনেও খাবার না পেলে ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্তিও লাগআর মাস শেষে বেতনের কথাও আকারে-ইঙ্গিতে মনে করিয়ে দিই।তবে একটি কথা বলতে পারি—শুধু বেতনের জন্য কোনো গরিব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট পড়া অন্তত আমার কাছে মিস হয় না।
গ্রামের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিছু আক্ষেপ:
মাঝেমধ্যে অনুতপ্ত হই—গ্রামে পরিশ্রমী শিক্ষার্থী কম পাই।
অনেক স্কুলশিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখন পড়াশোনা নয়; বরং ফাইনাল পরীক্ষার হলে কে যাবে, কে কীভাবে সুবিধা করে দেবে—সেই চিন্তা। আগে থেকেই কারও ‘পূজা’ শুরু হয়ে যাদুঃখজনকভাবে কিছু শিক্ষকও আছেন, যারা অসদুপায় অবলম্বন করে পাশ করার স্বপ্ন দেখান এবং শিক্ষার্থীদের একপ্রকার জিম্মি করে নিজের কাছে প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করেনপরীক্ষার আগে শর্ট সাজেশন দিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধার পরিসরও সংকুচিত করা হয়ভবিষ্যতে এসব শিক্ষার্থী কর্মজীবনে গিয়ে যখন হতাশ হবে, তখন হয়তো সেই শিক্ষকদেরও অসম্মান করবে। আর তখন দায়টা শুধু শিক্ষার্থীর নয়—শিক্ষকেআর আমার কাছে পড়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী ক্লাসে কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেছে, তাদের কাছেও আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।‘এটা হবে, ওটা হবে’—শুধু পড়াশোনা হয় না
বর্তমানে স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থী মূল কাজটি করছে না।
এটা হবে, সেটা হবে, ওটা করব—আরও কত কী হবে!
কিন্তু পড়াশোনা নেই।গ্রামে অনেক শিক্ষার্থী অমুক-তমুকের পেছনে ঘুরে নিজের ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিচ্ছে। অশিক্ষিত নেতার পেছনে ঘুরতে গিয়ে অনেক স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী বেয়াদব হয়ে উঠছে—যা সেই নেতাও হয়তো জানেন না।
আড্ডাও বেড়েছে। সেই আড্ডায় পড়াশোনা ছাড়া প্রায় সবকিছু নিয়েই আলোচনা হয়—জিএফ-বিএফ, কে কত দামের মোবাইল কিনবে, কে কার আগে মোটরসাইকেল কিনবে, কে কোন ভাইয়ের পেছনে ঘুরবে—এসবই যেন আলোচনার মূআমার টিউশনির শিক্ষার্থীরাও এসবের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এখন আর জোর করে বাধা দিই না। শুধু চাই, তারা যেন যথাসময়ে নিজের মূল কাজটি করে—পড়াশোনা করে, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা।
নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে:
টিউশনি করতে গিয়ে নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলেও পিষ্ট হয়েছিরুপসা, ফরিদগঞ্জ কেন্দ্রের নকল নিয়ে পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল। সেই নিউজের সঙ্গে রাসেল ইব্রাহীম জড়িত—এমন ধারণা থেকে স্থানীয় প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন অসাধু শিক্ষক আমার কাছে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে নিষেধ করেছযাদের আমি পড়াতাম, তাদের ফোন দেওয়া হয়েছে। পথেঘাটে অনুরোধ করা হয়েছে—আমার কাছে যেন না পড়ে, তাঁদের কাছে যেন যারা দিনরাত পড়াক, নকল সরবরাহ করতে না পারলে শিক্ষার্থীরা কাঁদতে থাকুক—আমি এসবের অংশ হতে চাইনি।আমি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পড়িয়েছি, এখনও পড়াচ্ছি। ফার্স্ট ক্লাসের শিক্ষার্থীও পড়িয়েছি।
মজার বিষয় হলো, তাঁদের নিষেধাজ্ঞায় আমার আয় কমেনি; বরং অভিজ্ঞতা বেড়েআর একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই—নকল বন্ধ করার পেছনে আমি জড়িত, এটি কেউ প্রমাণ করতে পারলে আমি আবারও নকল বন্ধ করব।টিউশনি আমার চালিকাশক্তি:
টিউশনি করতে করতে কখনো কখনো মনে হয়েছে—আমি যখন টিউশনি করছি, আমার বন্ধুরা তখন অ্যাকাডেমিক বই পড়ছে, ভালো চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেঅন্যদিকে টিউশনি, পড়ানো, নিজের পড়াশোনা, লেখা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে আমাকেও অনেক কিছু ছাড়তে হয়তবু টিউশনি আমার চলার পথের অন্যতম চালিকাশক্তি।
টিউশনির কারণে নিজের অনেক প্রয়োজন মিটেছে। অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর জীবন কাছ থেকে দেখেছি। পেয়েছি অসংখ্য অভিজ্ঞবন্ধুত্ব নিয়েও এখন খুব বেশি প্রত্যাশা করি না।মাঝেমধ্যে বলি—
‘বন্ধুর অপর নাম বন্ধুক।’
আর নিজের জন্য লিখেছি—
‘এই জগতে কেউ কারো নয়,যা দেখি—তা শুধু অভিনয়।’
হয়তো কথাগুলো একটু কঠিন। তবু জীবন আমাকে যতটুকু শিখিয়েছে, ততটুকুই বলিতাই এখন নিজেকে কাজে নিমজ্জিত রাখার চেষ্টা করি। টিউশনি করি, রাতে প্রস্তুতি নিই, লিখি। যার কাজ নেই, তার লাজ নেই—কাজ না থাকলে কাজ সৃষ্টি করার চেষ্টা করি।
মানুষ কাজে ব্যস্ত থাকলে অন্যের সমালোচনা করার সময় কম পায়। বরং তখন মানুষ নিজেই সমালোচিত হয়আজ ১৮ বছর:
৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮—আমার টিউশনি জীবনের শুরু।
আজ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
দেখতে দেখতে ১৮ বছর পূর্ণ হলো।
৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু আমার টিউশনি জীবনের ১৯তম বছর।
এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি শিক্ষার্থী আমার কাছে একেকটি গল্প, একেকটি শিক্ষা, একেকটি স্মৃতি।
কারও প্রতি আমার দুঃখ নেই। কারও প্রতি বদদোয়াও নেই।বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা।
জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই দুটি স্বপ্ন হৃদয়ে ধারণ করেছি—শিক্ষক হতে চাই, গীতিকার হতে চাইফিজিক্সে মাস্টার্স করেছি। ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় স্কুল পর্যায়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতা করছি, আলহামদুলিল্লআমি জানি, এখনও আদর্শ শিক্ষক হতে পারিনি। তবে ভালো শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করছি।গীতিকার হিসেবেও আরও অনেক পথ হাঁটতে চাই।
আর আমার জীবনের সবচেয়ে পুরোনো স্বপ্নটি এখনও একই রকম—পড়তে চাই,
পড়তে চাই,পড়তে চাই
এবং পড়াতে চাই।এই স্বপ্ন নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
আল্লাহ ভরসা।
সব শিক্ষার্থীর প্রতি ভালোবাসা।
লেখক: শিক্ষক ও গীতিকার
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬